বৃটিশ আইন আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় স্বাধীনতার ৫৪ বছরে ও ভূমি সেবা পরাধীন-জমির জটিলতায় পিষ্ট জনগ।
ভূমি অফিস ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে। অন্যদিকে ‘সাব-রেজিষ্ট্রি অফিস আইন মন্ত্রণালয়ের অধীনে। প্রকৃতপক্ষে জমির সকল কার্যক্রম ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ অফিসের মাধ্যমে হওয়ার কথা থাকলেও, ব্রিটিশ আইন এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে, ভূমি মন্ত্রণালয়ের জমি, আইন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে অর্থাৎ সাব-রেজিষ্ট্রি অফিসে, জমি রেজিষ্ট্রেশন করতে হয়।
সাব-রেজিষ্ট্রি অফিসে জমির মালিকানা যাচাই করার মতো কোন প্রকার রেকর্ড-রেজিস্ট্রার নাই এবং রেজিষ্ট্রিকৃত দলিলের মাধ্যমে বিক্রিত জমি, তাৎক্ষণিক জমির মূল রেকর্ড থেকে কর্তনের ব্যবস্থা না থাকায় এক জমি বার বার বিক্রি হচ্ছে।
সাব-রেজিষ্ট্রি অফিসে একজন ৮ম শ্রেণি পাস দলিল লেখকের মাধ্যমে সৃষ্টি হয় দলিল। দলিল থেকে ৯০% জমি সংক্রান্ত বিরোধ সৃষ্টি হয়। এখানেই জমির মূল সমস্যা।
বাংলাদেশের ৯৮% মানুষ জমি সংক্রান্ত কাগজপত্র বুঝেনা। যেখানে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, প্রফেসর, শিক্ষক, যারা দেশের সর্বোচ্চ শিক্ষিত জনগণ, তারাই জমি সংক্রান্ত কাগজপত্র সঠিকভাবে বুঝেনা, সেখানে সাধারণ মানুষ জমির কাগজপত্র বুঝার প্রশ্নই আসেনা।
এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ৮ম শ্রেণি পাস দলিল লেখকগণ কোটিপতি।
সাব-রেজিষ্ট্রি অফিসে সরকারি ভাবে নিয়োগ প্রাপ্ত জনবল, মাত্র ৭ থেকে ৮ জন।
বাকি ২০০ থেকে ৩০০ জন লাইসেন্স প্রাপ্ত দলিল লেখক এবং নকল-নবিশ। তাদের মধ্যে বেশির ভাগই ৮ম শ্রেণি পাস।
দলিল লেখক এবং নকল নবিশদের সরকারি ভাবে টাকা বেতন-ভাতা নাই।
তাদের মূল পেশা সিন্ডিকেট, চাঁদাবাজি এবং দালালি।
বিশেষ করে, দলিল লেখকগণ তাদের ব্যক্তিগত টাকা ইনকামের স্বার্থে, সাধারণ মানুষকে জমি সংক্রান্ত বিষয়ে, ভুল-ভাল পরামর্শের মাধ্যমে দলিল সম্পাদন করে দিয়ে সর্বনাশ করে ফেলছেন।
সাব-রেজিস্ট্রার এবং দলিল লেখকের মাধ্যমে,”সম্পাদিত একটি ভুল দলিল, শুধু এক ব্যক্তিকে নয়, একটি পরিবার ধবংস করে দেয়”। ‘সাব-রেজিস্ট্রারগণ “রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন ১৯৫০” এর ১৪৩(খ) ধারা অর্থাৎ ‘বন্টন-নামা’ অমান্য করে, দলিল রেজিষ্ট্রেশন করে দেওয়ার কারণে, বাংলাদেশের প্রতি ঘরে ঘরে জমি সংক্রান্ত বিরোধ সৃষ্টি হয়েছে।
সাব-রেজিষ্ট্রি অফিসে, দলিল ১ দিনেই হয়, স্বাক্ষর লাগে একজনের অর্থাৎ সাব-রেজিস্ট্রারের।
অন্যদিকে, ভূমি অফিসে খারিজ করতে সরকারি ভাবে সময় লাগে ২৮ কার্য দিবস, প্রায় ৪০ দিন, স্বাক্ষর লাগে এসিল্যান্ড (ম্যাজিস্ট্রেট) সহ ৪ থেকে ৫ জনের। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ভূমি অফিসে খারিজ করতে, সময় বেশি লাগে, তাই হয়রানি।
সাব-রেজিসট্রার এবং দলিল লেখকের মাধ্যমে সৃষ্টি ত্রুটিপূর্ণ বা জটিলতা যুক্ত দলিল নিয়ে, ভূমি অফিসে খারিজ করতে গেলে বিভিন্ন ধরনের হয়রানির শিকার হতে হয়। সাধারণ মানুষের জমি নিয়ে, সর্ব-প্রথম অর্থনৈতিক সুবিধা ভোগ করে “দলিল লেখক” এবং “সাব-রেজিষ্ট্রার”। রেজিষ্ট্রিকৃত দলিলের মধ্যে কোনো জটিলতা থাকলে অর্থনৈতিক সুবিধা ভোগ করে “ভূমি অফিস”। রেজিষ্ট্রিকৃত দলিলের কোনো জটিলতা নিয়ে মারামারি হলে, অর্থনৈতিক সুবিধা ভোগ করে “পুলিশ”। রেজিষ্ট্রিকৃত দলিলের কোনো জটিলতা নিয়ে মামলা হলে, অর্থনৈতিক সুবিধা ভোগ করে কোর্ট এবং কোর্টের আইনজীবী। এক জমি নিয়ে, দুই মন্ত্রণালয়ে টানাটানি, মাঝে পরে জমি সংক্রান্ত জটিলতায় পিষ্ট জনগণ।
ভূমি সেবা অর্ধেক আইন মন্ত্রণালয়ে, আর অর্ধেক ভূমি মন্ত্রণালয়ে রেখে, ভূমির সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়।
সম্প্রতি ভূমি সংস্কারের যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত “ভূমির সব সেবা আসবে এক ছাতার নিচে” অর্থাৎ “একক ভূমি ব্যবস্থাপনা”। সংস্কার কমিশন সুপারিশ করেছিলেন, সাব-রেজিষ্ট্রি অফিস আইন মন্ত্রণালয় থেকে, ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ করার।
সাব-রেজিষ্ট্রি অফিস বিলুপ্তি করে, ভূমির সকল কার্যক্রম ভূমি মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব অফিসের মাধ্যমে করার জন্য সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন হোক।
( সূত্র – ভূমি সেবা পরাধীন)