যমুনা অয়েল: রক্ষকই যখন ভক্ষক!অডিট প্রধান থেকে এমডি— ইউসুফ হোসেন ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ
নিজস্ব প্রতিবেদক
রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি তেল বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান যমুনা অয়েল কোম্পানি পিএলসি-তে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশাসনিক অস্থিরতা ও অনিয়মের অভিযোগ চলমান। সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটির সাবেক মহাব্যবস্থাপক (অডিট) মোঃ ইউসুফ হোসেন ভূঁইয়াকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার পর সেই বিতর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে।
অভিযোগ উঠেছে, অডিট বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি প্রতিষ্ঠানটির গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী ও আর্থিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সরাসরি যুক্ত ছিলেন। ফলে নিরীক্ষা কার্যক্রমের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে এবং ‘স্বার্থের সংঘাত’ (Conflict of Interest)-এর একটি গুরুতর নজির তৈরি হয়েছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
অডিট বিভাগের দায়িত্বে থেকেও নীতিনির্ধারণী প্রভাব
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মোঃ ইউসুফ হোসেন ভূঁইয়া মহাব্যবস্থাপক (অডিট) হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে একই সাথে কোম্পানি সচিবসহ অন্তত ৬টি গুরুত্বপূর্ণ অতিরিক্ত দায়িত্বে ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, বিটুমিন বরাদ্দ, পদায়ন এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক কমিটির প্রভাবশালী সদস্য হিসেবে তিনি এমন কিছু সিদ্ধান্তে জড়িত ছিলেন, যেগুলোর নিরপেক্ষ অডিট পরবর্তীতে আর হয়নি।
প্রতিষ্ঠানের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, “অডিট বিভাগের মূল দায়িত্ব হচ্ছে অনিয়ম শনাক্ত করা। কিন্তু যখন অডিট প্রধান নিজেই বিতর্কিত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সঙ্গে জড়িত থাকেন, তখন সেই বিভাগ কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে।”
ফতুল্লা ডিপোতে ডিজেল গায়েব: প্রশ্নের মুখে অডিট ভূমিকা
যমুনা অয়েলের নারায়ণগঞ্জ ফতুল্লা ডিপো থেকে প্রায় ৩ লাখ ৭৫ হাজার লিটার ডিজেল গায়েব হওয়ার ঘটনায় অডিট বিভাগের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, ট্যাংক রি-ক্যালিব্রেশন জালিয়াতির মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে একটি সংঘবদ্ধ চক্র তেল চুরি করে আসছিল।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, অডিট বিভাগ বিষয়টি সম্পর্কে অবগত থাকলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি। বরং অভিযুক্ত সিন্ডিকেটকে প্রশাসনিক সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। এর বিপরীতে বিটুমিন বরাদ্দ ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধার মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার অবৈধ সুবিধা আদায়ের অভিযোগও উঠেছে।
যমুনা অয়েলে অনিয়মের খতিয়ান
নিখোঁজ ডিজেল: প্রায় ৩,৭৫,০০০ লিটার
আনুমানিক আর্থিক ক্ষতি: প্রায় ৪ কোটি ১২ লাখ টাকা
অডিট আপত্তি: গত ৫ বছরে শতাধিক বড় আপত্তি
নিষ্পত্তিহীন অভিযোগ: অধিকাংশ অডিট আপত্তির সুরাহা হয়নি
দ্বৈত দায়িত্ব: অডিট প্রধান হয়েও ৬টি অতিরিক্ত গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন
বিটুমিন বরাদ্দে সম্পৃক্ততা: বছরে প্রায় ২০-৩০ হাজার মেট্রিক টন বরাদ্দ প্রক্রিয়ায় সরাসরি সংশ্লিষ্টতা
প্রশাসনিক অস্থিরতা ও হাতাহাতির অভিযোগ
এমডি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রতিষ্ঠানটিতে কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রকাশ্য বিরোধ, প্রশাসনিক দ্বন্দ্ব এবং হাতাহাতির ঘটনাও ঘটেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এতে প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও চেইন অব কমান্ড নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, “রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের অস্থিতিশীলতা জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।”
বিপিসি’র বক্তব্য
এ বিষয়ে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি)-এর একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন—
> “যমুনা অয়েলের সাম্প্রতিক অস্থিরতা ও কর্মকর্তাদের মধ্যে সংঘর্ষের বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। ইউসুফ হোসেন ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে অডিট সংক্রান্ত যেসব অভিযোগ উঠেছে, তা পর্যালোচনার জন্য একটি অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া চলছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এডি ইউসুফ হোসেন ভূঁইয়ার বক্তব্য
অভিযোগের বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে মোঃ ইউসুফ হোসেন ভূঁইয়া বলেন—
> “আমার বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। আমি নিয়ম মেনেই দায়িত্ব পালন করেছি। কিছু স্বার্থান্বেষী মহল আমার সংস্কারমূলক কার্যক্রমে বাধা দিতেই এসব অপপ্রচার চালাচ্ছে।”
বিশেষজ্ঞদের মতামত
টিআইবি’র মন্তব্য
Transparency International Bangladesh (TIB)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন—
> “অডিট বিভাগ একটি প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতার প্রধান রক্ষাকবচ। কিন্তু অডিট প্রধান নিজেই যখন নীতিনির্ধারণী ও লাভজনক কমিটিতে যুক্ত থাকেন, তখন সেখানে স্বার্থের সংঘাত চরম আকার ধারণ করে। বিতর্কিত কর্মকর্তাদের পুরস্কৃত করা হলে তা প্রতিষ্ঠানকে দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত করে।”
জ্বালানি বিশেষজ্ঞের মন্তব্য
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলেন—
> “জ্বালানি খাতের মতো স্পর্শকাতর জায়গায় প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের সংকট নয়, এটি জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তার জন্যও হুমকি। অতীতের অভিযোগ তদন্ত না করেই বিতর্কিত কর্মকর্তাদের শীর্ষ পদে বসানো হলে সাধারণ মানুষ ও রাষ্ট্র উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।”
সুশাসন নিয়ে উদ্বেগ
বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে একই ব্যক্তির হাতে অডিট, প্রশাসন ও নীতিনির্ধারণী ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন সুশাসনের পরিপন্থী। দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগ যাচাই এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরীণ সংকট আরও গভীর হতে পারে।
জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর হস্তক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।