আনোয়ারা সাব-রেজিস্ট্রার জোবাইরের জালিয়াতি, সরকারি রাজস্ব ফাঁকি, জমির শ্রেণি পরিবর্তন, ও প্রকাশ্যে ঘুষ গ্রহণ ও ঝাড়ুদার আহাদের নিয়ন্ত্রণে অফিস
অনুসন্ধানী প্রতিবেদন-
সাব-রেজিস্ট্রারে জোবাইরের বিরুদ্ধে কোটি টাকার অনিয়মের বিস্ফোরক অভিযোগ-ঝাড়ুদার আহাদের নিয়ন্ত্রণে অফিস,
সাব-রেজিস্ট্রি অফিসকে ঘিরে ভয়াবহ দুর্নীতি, দলিল জালিয়াতি, সরকারি রাজস্ব ফাঁকি, জমির শ্রেণি পরিবর্তন এবং প্রকাশ্যে ঘুষ বাণিজ্যের বিস্ফোরক অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন বর্তমান সাব-রেজিস্ট্রার মোঃ জুবাইর হোসেন এবং অফিসের দৈনিক ভিত্তিক ঝাড়ুদার আবদুল আহাদ।
স্থানীয় ভুক্তভোগী, দলিল সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র এবং অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে অফিসের ভেতরে ও বাইরে একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষকে বাধ্যতামূলকভাবে ঘুষ দিতে হচ্ছে। ঘুষ ছাড়া দলিল নিবন্ধন, নকল উত্তোলন, জমির রেকর্ড অনুসন্ধান কিংবা সংশোধনের কাজ সম্পন্ন হয় না।
অফিস সহকারীর চেয়ারে বসে প্রকাশ্যে ঘুষ আদায়
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ও ছবিতে দেখা যায়, অফিস সহকারীর নির্ধারিত চেয়ারে বসে প্রকাশ্যে অর্থ লেনদেন করছেন ঝাড়ুদার হিসেবে পরিচিত আবদুল আহাদ। স্থানীয়দের দাবি, অফিসে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ এখন তার হাতেই।
একাধিক ভুক্তভোগী অভিযোগ করেন,
“দলিল অনুযায়ী ঘুষের রেট নির্ধারণ করেন আহাদ। টাকা না দিলে ফাইল আটকে রাখা হয়, এমনকি রেজিস্ট্রিও বন্ধ করে দেওয়া হয়।”
অভিযোগ রয়েছে, সাব-রেজিস্ট্রার জুবাইর হোসেনের প্রত্যক্ষ আশ্রয়-প্রশ্রয়ে আবদুল আহাদ অফিসের রেকর্ড রুম, দলিল সংশোধন, নকল উত্তোলন এবং বিভিন্ন আর্থিক লেনদেন নিয়ন্ত্রণ করছেন।
‘৭০ টাকার শ্রমিক’ থেকে কোটিপতি!
স্থানীয় সূত্র জানায়, একসময় ভাতের হোটেলে কাজ করা আবদুল আহাদ দৈনিক ৭০ টাকা মজুরিতে ঝাড়ুদারের কাজ শুরু করেন। বর্তমানে তার নামে-বেনামে বিপুল সম্পদের অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, ঘুষের টাকায় তিনি নির্মাণ করেছেন আলিশান বাড়ি, ব্যবহার করছেন প্রায় ৩ লাখ টাকার মোটরসাইকেল, কিনেছেন জমি, অটোরিকশা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। ব্যাংকে রয়েছে একাধিক এফডিআরও।
সূত্রগুলোর দাবি, প্রতিদিন আনুমানিক কয়েক লাখ টাকার ঘুষ বাণিজ্য পরিচালিত হয়। দলিলভেদে কমিশন নির্ধারণ করা হয় এবং সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা হয়।
৪৪ লাখ টাকার সম্পত্তি ১৮ লাখ দেখিয়ে রেজিস্ট্রি!
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে সরকারি রাজস্ব ফাঁকির চাঞ্চল্যকর তথ্য। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৫ সালের ৭ মে সম্পাদিত একটি কবলা দলিলে (নং-২০৩৭) প্রকৃত ৪৪ লাখ টাকার সম্পত্তি মাত্র ১৮ লাখ টাকা দেখিয়ে নিবন্ধন করা হয়।
এর মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ সরকারি কর ও রেজিস্ট্রেশন ফি ফাঁকি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। একই ধরনের আরও একাধিক দলিলের তথ্য অনুসন্ধানকারীদের হাতে রয়েছে বলে জানা গেছে।
একই জমি একই দিনে দুই দলিলে নিবন্ধন!
আরও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে আনোয়ারা সদর ইউনিয়নের খিলপাড়া মৌজার একটি জমি নিয়ে। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রায় দেড় কোটি টাকা মূল্যের ১০ শতক জমি একই দিনে দুটি পৃথক দলিলের মাধ্যমে নিবন্ধন করা হয়েছে।
একটি ছিল পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দলিল (নং-৪৪৩৫) এবং অন্যটি সাব-কবলা দলিল (নং-৪৪৩৭)।
ভুক্তভোগীদের দাবি, প্রায় সাড়ে ৩ লাখ টাকা ঘুষের বিনিময়ে আইনবিরোধীভাবে একই জমির দুটি দলিল সম্পন্ন করা হয়।
ভূমি আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, একই দিনে একই সম্পত্তির পৃথক দুই ধরনের দলিল নিবন্ধন গুরুতর অনিয়ম এবং তা তদন্তসাপেক্ষ অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
‘সিসিইউতে থাকা নারীর স্বাক্ষরে দলিল!’
অভিযোগ রয়েছে, ২০২৪ সালের ২২ আগস্ট চাতুরী ও বেলচূড়া মৌজায় ৩৫৫০, ৩৫৪৬, ৩৫৪৭ ও ৩৫৪৯ নম্বরের একাধিক ভূয়া দলিল তৈরি করা হয়।
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর অভিযোগ হলো—যার স্বাক্ষর ব্যবহার করা হয়েছে বলে দেখানো হয়েছে, সেই আনোয়ারা বেগম তখন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সিসিইউতে ভর্তি ছিলেন।
এ ঘটনায় মিল্টন পালিত নামের এক ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও উঠেছে।
রেকর্ড রুমে অননুমোদিত প্রবেশের অভিযোগ
স্থানীয় সূত্র দাবি করেছে, অফিসের রেকর্ড রুমে অননুমোদিত ব্যক্তিদের প্রবেশের সুযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে দলিলের পৃষ্ঠা পরিবর্তন, কাটাছেঁড়া, ঘষামাজা এবং জমির শ্রেণি পরিবর্তনের মতো গুরুতর অনিয়ম সংঘটিত হচ্ছে।
এছাড়া নকল উত্তোলন, রেকর্ড অনুসন্ধান ও জমির তথ্য সংশোধনের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
দুদকে অভিযোগ, সংবাদ প্রকাশ—তবুও বহাল সিন্ডিকেট
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বিষয়টি নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। গণমাধ্যমেও একাধিকবার সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পরও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা দৃশ্যমান হয়নি।
স্থানীয়দের ভাষ্য,
“দুদকে অভিযোগ দিয়েও কোনো প্রতিকার পাইনি। বরং অভিযোগের পর দালালচক্র আরও প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে।”
প্রশাসনের নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন-
একের পর এক অভিযোগ, ভিডিও ও তথ্য প্রকাশ্যে এলেও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয় সচেতন মহলের ভাষ্য,
“আনোয়ারা সাব-রেজিস্ট্রি অফিস এখন সাধারণ মানুষের সেবাকেন্দ্র নয়; এটি দুর্নীতি, দালালচক্র ও জালিয়াতির অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে।”
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে সাব-রেজিস্ট্রার মোঃ জুবাইর হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত দাবি-
ভুক্তভোগী ও সচেতন নাগরিকরা অবিলম্বে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), আইন মন্ত্রণালয়, জেলা প্রশাসন এবং নিবন্ধন অধিদপ্তরের উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত দাবি করেছেন।
তাদের মতে, অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হলে শুধু আনোয়ারা নয়, বৃহত্তর ভূমি নিবন্ধন ব্যবস্থার ভয়াবহ দুর্নীতির চিত্রও উঠে আসবে।