সাহস আর সততার অনন্য দৃষ্টান্ত: বদলে গেছে কোতোয়ালি থানার চেনা চিত্র!একজন ওসির সদিচ্ছাই যথেষ্ট: সব থানা কি পারবে কোতোয়ালির পথ অনুসরণ করতে?
বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন
দেশের প্রতিটি জেলা ও মহানগরের ‘হৃৎপিণ্ড’ বলা যায় কোতোয়ালি থানা এলাকাগুলোকে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) কোতোয়ালী থানা প্রশাসনিক, বাণিজ্যিক ও সামাজিক দিক থেকে অত্যন্ত সংবেদনশীল ও চ্যালেঞ্জিং. অপরাধের বহুমাত্রিক রূপ, ভাসমান জনবসতি, আর রাজনৈতিক-বাণিজ্যিক প্রভাবশালীদের চাপ সামলে এখানে শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখা যেকোনো পুলিশ কর্মকর্তার জন্যই কঠিন পরীক্ষা।
গত ২৬ ডিসেম্বর এই গুরুত্বপূর্ণ থানার দায়িত্ব নেন অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ আফতাব উদ্দিন দায়িত্ব নেওয়ার পর মাত্র ৪ মাসে তাঁর নেতৃত্বে পরিচালিত ধারাবাহিক অভিযানে প্রায় ১ হাজার ৪০০ ও বেশী অপরাধীকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং উদ্ধার হয়েছে বিপুল পরিমাণ মাদক ও অস্ত্র. প্রচারসর্বস্ব কাজের চেয়ে মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান ফলাফলের কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে যেমন আস্থা ফিরছে, তেমনি জনমনে প্রশ্ন উঠেছে—দেশের বাকি সব থানার ওসিরা যদি এমন সাহসিকতা ও সততার সাথে দায়িত্ব পালন করতেন, তবে কি দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন সম্ভব হতো না?
‘কোতোয়ালি মডেল’: মাঠের সক্রিয়তা ও জিরো টলারেন্স
অনুসন্ধানে দেখা যায়, সিএমপির কোতোয়ালি থানার সাম্প্রতিক সাফল্যের পেছনে কাজ করছে ওসির ব্যক্তিগত মনিটরিং এবং ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি.
১. সন্ত্রাসী ও গ্যাং কালচার দমন: শীর্ষ সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ এবং কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে নিয়মিত বিশেষ ড্রাইভ পরিচালনা করা হচ্ছে, যা টাইগারপাস ও মেরিনার্স রোডের মতো অপরাধপ্রবণ এলাকাগুলোকে অনেকটাই শান্ত করেছে.
২. মাদক নির্মূলে সাঁড়াশি অভিযান: বড় বড় মাদকের চালান জব্দসহ কোটি টাকা মূল্যের মাদক উদ্ধার পুলিশের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়িয়েছে.
৩. বিচারের মুখোমুখি করা: পলাতক ও সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের দ্রুততম সময়ে আইনের আওতায় এনে আদালতে সোপর্দ করা হচ্ছে.
দেশের সকল থানায় কেন এই মডেলের বাস্তবায়ন প্রয়োজন?
একজন ওসির সদিচ্ছা কীভাবে পুরো এলাকার চিত্র বদলে দিতে পারে, কোতোয়ালি থানা তার অন্যতম উদাহরণ। দেশের ৪৯৫টিরও বেশি থানায় এই ধারা নিশ্চিত করা গেলে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের গ্রাফ উল্লেখযোগ্য হারে নামিয়ে আনা সম্ভব। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই পরিবর্তন আনতে তিনটি বড় সংস্কার প্রয়োজন:
* তৃণমূল জবাবদিহিতা: থানাকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রেখে ওসিদের স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে হবে।
* পেশাদারিত্ব ও সততা: ঘুষ, হয়রানি ও অনৈতিক সুবিধার বিরুদ্ধে শতভাগ কঠোর অবস্থান নিশ্চিত করা।
* জনবান্ধব পুলিশিং: সাধারণ মানুষ যেন থানায় এসে কোনো মধ্যস্বত্বভোগী বা দালালের চক্র ছাড়াই সরাসরি ওসির সাথে কথা বলে আইনি সহায়তা পেতে পারেন।
চ্যালেঞ্জ ও সীমাবদ্ধতা
তবে এই ইতিবাচক চিত্রের আড়ালে কিছু ভিন্ন মাত্রার অভিযোগ ও চ্যালেঞ্জও উঠে এসেছে। কোনো কোনো মহলের দাবি, মাঠপর্যায়ে কঠোর অভিযান চললেও ভেতরের কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক পক্ষপাত বা অনৈতিক সুরক্ষার অভিযোগও ওঠে, যা তদন্তসাপেক্ষ. একই সাথে, পুলিশের আধুনিকায়ন এবং জনবল সংকটের মতো প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা দূর করা না গেলে কেবল একক কোনো কর্মকর্তার প্রচেষ্টায় দীর্ঘমেয়াদে পুরো ব্যবস্থা পরিবর্তন করা কঠিন.
বিশেষজ্ঞদের অভিমত
অপরাধ বিজ্ঞানীরা মনে করেন, পুলিশ প্রশাসনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদটি হলো থানার ‘অফিসার ইনচার্জ’ বা ওসি। ওসির চেয়ারটি সৎ ও সাহসী থাকলে অপরাধীরা আশ্রয় পায় না। সারা দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির স্থায়ী টেকসই রূপান্তর চাইলে কেবল বদলি বা রদবদল নয়, বরং প্রতিটি থানায় মোহাম্মদ আফতাব উদ্দিনের মতো কার্যকর ও মাঠকেন্দ্রিক ‘সাইলেন্ট পারফর্মার’দের মূল্যায়ন করতে হবে এবং তাঁদের কাজের প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে.
অপরাধ দমনে সিএমপি কোতোয়ালি থানার এমন মাঠকেন্দ্রিক সক্রিয়তা ও জিরো টলারেন্স নীতি দেশজুড়ে প্রশংসিত হচ্ছে। সাধারণ মানুষের দাবি, দেশের প্রতিটি থানায় এমন ‘কোতোয়ালি মডেল’ চালু করা হোক।