বন্দরের কনটেইনার টেন্ডার:
মাফিয়া কোম্পানির সুবিধায় বিশেষ শর্তের দেয়াল-চট্টগ্রাম বন্দরের টেন্ডার সিন্ডিকেট ভাঙার দাবি ব্যবসায়ীদের.
চট্টগ্রাম বন্দরের টেন্ডার দুই কোম্পানির মাপে! ৫০ কোটির শর্তে ‘কাটা’’বাকিরা-বন্দর খেকো মাফিয়া তরফদারের নিয়ন্ত্রণে.
চট্টগ্রাম বন্দরের টেন্ডার দুই কোম্পানির মাপে! ৫০ কোটির শর্তে ‘কাটা’ বাকিরা-এমপি ও আওয়ামী আমলের’একচেটিয়া নিয়ন্ত্রক’বন্দর খেকো মাফিয়া তরফদারের নিয়ন্ত্রণে।
একটি শর্তেই প্রতিযোগিতার বাইরে শত শত অভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠান; ঘুরেফিরে সুবিধা পাচ্ছে এমপি সেলিম ও আওয়ামী আমলের’একচেটিয়া নিয়ন্ত্রক’বন্দরখেকো মাফিয়া এখন’দেশপ্রেমিক বিনিয়োগকারী
সরকারের সুবিধা ভোগী, বিতর্কিত
ব্যবসায়ী তরফদারের সিন্ডিকেট
চট্টগ্রাম বন্দরের জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি) এলাকায় খালি কনটেইনার স্থানান্তরের দরপত্রে (টেন্ডার) এক অভিনব ‘শর্তের দেয়াল’ তোলার অভিযোগ উঠেছে। টেন্ডারের একটি মাত্র বিশেষ শর্তের বেড়াজালে পড়ে শুরুতেই প্রতিযোগিতা থেকে ছিটকে গেছেন দেশের শত শত অভিজ্ঞ লজিস্টিকস প্রতিষ্ঠান ও অফডক (আইসিডি) অপারেটররা। আর এই সুনির্দিষ্ট মাপে কাটা শর্তের সুযোগ নিয়ে প্রতিযোগিতায় টিকে রয়েছে মাত্র দুটি প্রতিষ্ঠান।
প্রতিষ্ঠান দুটি হলো— বিএনপির সংসদ সদস্য শাহাদাত হোসেন সেলিমের মালিকানাধীন ‘এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেস’ এবং বিগত সরকারের সময়ে বন্দর সেক্টরে একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তারকারী বিতর্কিত ব্যবসায়ী তরফদার রুহুল আমীনের ‘সাইফ পাওয়ারটেক’।
বন্দর সংশ্লিষ্ট সাধারণ ব্যবসায়ী ও লজিস্টিকস খাতের উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, উন্মুক্ত প্রতিযোগিতাকে বাধাগ্রস্ত করতে এবং নির্দিষ্ট সিন্ডিকেটকে সুবিধা দিতেই দরপত্রে এই ‘৫০ কোটির দেয়াল’ বা বিশেষ আর্থিক ও অভিজ্ঞতার শর্ত যুক্ত করা হয়েছে।
ঘুরেফিরে সেই ডিপিএম সুবিধা
অনুসন্ধানে জানা গেছে, চট্টগ্রাম বন্দরের বিগত ১৭ বছরের ইতিহাসে এই খালি কনটেইনার স্থানান্তরের কাজটিতে একটি নির্দিষ্ট চক্রের আধিপত্য বজায় রয়েছে। ২০১৩ সালে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে প্রথমবার এই কাজটি পেয়েছিল ‘এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেস’। এরপর থেকে প্রতিবার টেন্ডার আহ্বান করা হলেও রহস্যজনক আইনি মামলা ও জটিলতা তৈরি করে পুরো প্রক্রিয়া স্থগিত করে দেওয়া হয়।
দরপত্র প্রক্রিয়া ভেস্তে যাওয়ার অজুহাতে বন্দর কর্তৃপক্ষ প্রতিবারই সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি বা ডিপিএম (Direct Procurement Method) ব্যবহার করে ঘুরেফিরে ‘এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেস’কেই কাজটি দিয়ে আসছে। এই ডিপিএম সুবিধার আওতায় বন্দর কর্তৃপক্ষ প্রতি বছর প্রতিষ্ঠানটিকে প্রায় ১৯ কোটি ৬০ লাখ টাকা পরিশোধ করছে, যা সাধারণ প্রতিযোগিতামূলক দরের চেয়ে অনেক বেশি বলে অভিযোগ রয়েছে।
২০২৩ সালের টেন্ডার ও নতুন সমীকরণ
এরপর ২০২৩ সালে নতুন করে দরপত্র আহ্বান করা হলে সেখানে সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে সাইফ পাওয়ারটেক। তবে সেবারও আইনি জটিলতা ও মামলার মারপ্যাঁচে আটকে যায় চূড়ান্ত কার্যাদেশ। সর্বশেষ চলতি দরপত্রে এমন কিছু কঠিন শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে, যা দেশের আর কোনো লজিস্টিকস প্রতিষ্ঠানের পক্ষে পূরণ করা সম্ভব নয়। ফলে এবারও ঘুরেফিরে মাঠ ফাঁকা পেয়ে গেছে শাহাদাত হোসেন সেলিমের এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেস এবং তরফদার রুহুল আমীনের সাইফ পাওয়ারটেক।
যা বলছেন সংশ্লিষ্টরা
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাদ পড়া দুটি অফডক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, “চট্টগ্রাম বন্দরে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা বন্ধ করার জন্য এটি একটি পরিকল্পিত চাল। টেন্ডার প্রক্রিয়ায় ইচ্ছাকৃতভাবে এমন কিছু ফাঁকফোকর ও শর্ত রাখা হয় যাতে নির্দিষ্ট সিন্ডিকেট ছাড়া কেউ অংশ নিতে না পারে। আর কেউ অংশ নিলেও যেন মামলা করে সহজেই পুরো দরপত্র প্রক্রিয়াটি ঝুলিয়ে দেওয়া যায়।”
সার্বিক বিষয়ে জানতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি নীতিগত সিদ্ধান্তের অজুহাত দেখিয়ে সরাসরি মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে তিনি বলেন, “বন্দরের কাজের গতিশীলতা ও নিরাপত্তার স্বার্থেই অভিজ্ঞতার কিছু শর্ত দিতে হয়। এখানে কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়ার উদ্দেশ্য নেই।”
ব্যবসায়ীদের দাবি, বন্দরের এই গুরুত্বপূর্ণ কাজটি নির্দিষ্ট সিন্ডিকেটের কব্জা থেকে মুক্ত করতে অবিলম্বে এই বিতর্কিত শর্ত বাতিল করে পুনরায় স্বচ্ছ ও উন্মুক্ত টেন্ডার আহ্বান করা প্রয়োজন।