চট্টগ্রাম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে: নানামুখী চ্যালেঞ্জ, রাজনৈতিক প্রভাব ও জটিলতা মোকাবিলা করে দৃশ্যমান মেগা প্রকল্প.
চট্টগ্রামের যানজট নিরসন ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় যুগান্তকারী পরিবর্তনের লক্ষ্যে বাস্তবায়িত হচ্ছে ‘শহীদ ওয়াসিম আকরাম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে’। লালখান বাজার থেকে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পর্যন্ত বিস্তৃত চট্টগ্রামের প্রথম এই মেগা এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণে প্রকৌশল ও প্রশাসনিক স্তরে নানামুখী বাস্তবমুখী চ্যালেঞ্জ ও জটিলতা মোকাবিলা করতে হয়েছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে (সিডিএ) প্রকল্প পরিচালক মাহফুজ রহমান কে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, অত্যন্ত ব্যস্ত এই বাণিজ্যিক নগরীতে লাইভ ট্রাফিকের চাপ সামলানোই ছিল সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। মূল সড়ক সচল রেখে এবং পতেঙ্গা টানেল সংলগ্ন ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার সাথে সমন্বয় করে এই বিশাল অবকাঠামো নির্মাণ করতে হয়েছে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, আরেকটি বড় জটিলতা ছিল মাটির নিচের ইউটিলিটি শিফটিং। মাটির নিচ দিয়ে যাওয়া ওয়াসা, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগের পুরোনো ও জটিল লাইনগুলো সুবিন্যস্তভাবে স্থানান্তর করা ছিল অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ কাজ। এছাড়া, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ এবং বাংলাদেশ রেলওয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সংস্থার কাছ থেকে সময়মতো জমি পাওয়ার ক্ষেত্রে বড় ধরনের প্রশাসনিক জটিলতা পোহাতে হয়েছে।
সব ধরনের প্রকৌশল ও প্রশাসনিক বাধা টপকে মেগা প্রকল্পটি চট্টগ্রামের অর্থনীতি ও যোগাযোগে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে যাচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।
চ্যালেঞ্জের পাহাড় ডিঙিয়ে চট্টগ্রামের প্রথম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে
চট্টগ্রামের লালখান বাজার থেকে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। একসময় এই পথটুকু পাড়ি দিতেই নগরবাসীকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকতে হতো। সেই চিরচেনা যানজটের ভোগান্তি দূর করতে নির্মিত হয়েছে ‘শহীদ ওয়াসিম আকরাম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে’। তবে বাইরে থেকে বিশাল এই উড়ালসেতুটি যতটুকু দৃষ্টিনন্দন, এর পেছনের নির্মাণযজ্ঞ মোটেও সহজ ছিল না। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে (সিডিএ) এই মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে পদে পদে লড়তে হয়েছে নানামুখী বাস্তব সমস্যা ও জটিলতার বিরুদ্ধে।
জমি অধিগ্রহণ ও সমন্বয় জটিলতা:
একটি মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ভূমি। এই এক্সপ্রেসওয়ের রুট নির্ধারণের পর চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ এবং বাংলাদেশ রেলওয়ের মালিকানাধীন জমি ব্যবহারের প্রয়োজন পড়ে। কিন্তু আন্তঃসংস্থা সমন্বয়হীনতা এবং আইনি প্রক্রিয়ার কারণে সময়মতো জমি পাওয়ার ক্ষেত্রে তৈরি হয়েছিল বড় ধরনের প্রশাসনিক জটিলতা। যা প্রকল্পের গতিকে বারবার বাধাগ্রস্ত করেছে।
মাটির নিচের অদৃশ্য বাধা: ইউটিলিটি শিফটিং:
মাটির ওপরে পিলারের কাজ শুরুর আগে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল মাটির নিচের অদৃশ্য গোলকধাঁধা। বছরের পর বছর ধরে মাটির নিচ দিয়ে অপরিকল্পিতভাবে যাওয়া ওয়াসা, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগের লাইনগুলো সুবিন্যস্তভাবে স্থানান্তর করা ছিল অত্যন্ত জটিল। নিখুঁত পরিকল্পনা ছাড়া এই কাজ করতে গেলে পুরো নগরীর নাগরিক সেবা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা ছিল। ফলে ধীরস্থিরভাবে ও অত্যন্ত সতর্কতার সাথে এই ইউটিলিটি শিফটিংয়ের কাজ শেষ করতে হয়েছে।
লাইভ ট্রাফিকের তীব্র চাপ:
চট্টগ্রামের লাইভ ট্রাফিক সচল রাখা ছিল এই প্রকল্পের অন্যতম প্রধান প্রকৌশলগত চ্যালেঞ্জ। লালখান বাজার থেকে পতেঙ্গা পর্যন্ত সড়কটি চট্টগ্রামের অর্থনীতির লাইফলাইন। এই ব্যস্ততম প্রধান সড়কটি পুরোপুরি বন্ধ না করে, একদিকে গাড়ি চলাচল সচল রাখা এবং অন্যদিকে পতেঙ্গা টানেল সংলগ্ন ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার সাথে শতভাগ সমন্বয় রেখে বিশাল এই নির্মাণকাজ পরিচালনা করতে হয়েছে।
নকশা পরিবর্তন, ইউটিলিটি শিফটিং কিংবা আন্তঃসংস্থা সমন্বয়—সব ধরনের বাস্তবমুখী সংকট মোকাবিলা করেই আজ এই মেগা প্রকল্প দৃশ্যমান। সব বিতর্ক ও সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে এই এক্সপ্রেসওয়ে চট্টগ্রামের ব্যবসা-বাণিজ্য ও পর্যটনে
ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।