• রবিবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:২৬ অপরাহ্ন
Headline
বাংলাদেশে প্রাইভেট ডিটেকটিভ কার্যক্রমে নতুন দিগন্ত: মুনীর চৌধুরী প্রাইভেট ডিটেকটিভ লিমিটেড আদালতের আদেশ উপেক্ষা করে রিহ্যাব নির্বাচনে ‘কালক্ষেপণ’: নূর উদ্দিনকে বিজয়ী ঘোষণায় গড়িমসি, কমিশনের রহস্যজনক ভূমিকা। সেবা নিতে এসে কেউ ফিরে না খালি হাতে : ডিসি জাহিদ এর দরবারে। কোট অব আর্মস-এর ঊর্ধ্বে আত্মা: প্রিন্স পাওলো ডি বুরবোঁ রিবেজ্জি এবং হৃদয়ের উত্তরাধিকার — অরলান্ডো সিমিয়েলে হাইকোর্টের আদেশে রিহ্যাব নির্বাচনে মোর্শেদুল হাসানের প্রার্থিতা বাতিল; নূর উদ্দিনকে বিজয়ী ঘোষণার দাবি রিহ্যাব নির্বাচনে মোর্শেদুল হাসানের প্রার্থীতা বাতিল-ভাইস প্রেসিডেন্ট (চট্টগ্রাম) পদে একক প্রার্থী নূর উদ্দিন বিপিসিতে বড় রদবদল: একযোগে ৭ শীর্ষ কর্মকর্তার বদলি জনসেবায় অনন্য দৃষ্টান্ত: চকবাজার থানার ওসি বাবুল আজাদ ১৮ নং পূর্ব বাকলিয়া ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে জনসমর্থনে এগিয়ে হাজী মোহাম্মদ মুসা অশুভ বিনাশী সুন্দর আগামীর প্রত্যাশায় দেশবাসীকে মুনীর চৌধুরীর নববর্ষের শুভেচ্ছা

বন্দর-কূটনীতি, নেট-জিরোর আলোকে চট্টগ্রাম বন্দরের পরবর্তী অভিযাত্রা – রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান, চেয়ারম্যান, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ.

Reporter Name / ৫৬৬ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ৬ নভেম্বর, ২০২৫

চলতি বছর ৭ থেকে ১০ অক্টোবর আমি জাপানের কোবে শহরে আন্তর্জাতিক বন্দর ও হারবার সমিতি (আইএপিএইচ) আয়োজিত বিশ্ব বন্দর সম্মেলনে যোগ দিই। এর পেছনে আমার দুটি লক্ষ্য ছিল। এক. সংলাপকে অংশীদারিতে রূপান্তর করা এবং দুই. বাংলাদেশের সমুদ্র খাতকে তার পরবর্তী অভিযাত্রার লক্ষ্যে উপযুক্ত সক্ষমতার জন্য প্রস্তুত করা। বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় প্রতিটি বন্দর কর্তৃপক্ষ কোবে সম্মেলনে যোগ দেয়।
চট্টগ্রাম বন্দরের জন্য একটি শক্তিশালী অবস্থান নিশ্চিত করতে সমুদ্র খাতের এই বিশ্বসভায় অংশ নেওয়াটা বাংলাদেশের জন্য ছিল এক অনন্য সুযোগ। আমার নিজের জন্যও ছিল বিশেষ সম্মানের। আর সেটি এমন এক সময়ে—যখন দেশের সমুদ্র খাতের উন্নয়নে অভূতপূর্ব গুরুত্ব দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
বৈশ্বিক বাণিজ্যের সঙ্গে বাংলাদেশের সংযোগ প্রতিষ্ঠা : সম্মেলনে হামবুর্গ বন্দর কর্তৃপক্ষের শীর্ষ নির্বাহী ইয়েন্স মেয়ার এবং জাপানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠককালে আমি ইউরোপ ও জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের সরাসরি নৌ রুট চালুর প্রস্তাব তুলে ধরি।
এই রুটগুলো চালু করা গেলে জাহাজের ট্রানজিট টাইম কমবে, ব্যয় হ্রাস পাবে; ক্রমবর্ধমান অনিশ্চয়তামুখী বাজারে রপ্তানিকারকদের জন্য নির্ভরযোগ্য শিডিউল নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। ইয়েন্স মেয়ার এ ব্যাপারে আন্তরিক সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। এ ছাড়া জাপানও সরাসরি নৌযোগাযোগ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এর বাণিজ্যিক সম্ভাব্যতা নিশ্চিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
কেন জরুরি ছিল কোবে ২০২৫ : এমন এক সময়ে কোবে সম্মেলন অনুষ্ঠিত হলো, যখন বৈশ্বিক বাণিজ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ পার করছে।

সম্মেলনের বিভিন্ন অধিবেশনে আলোচ্যসূচির মধ্যেও তার প্রতিফলন দেখা গেছে। ভূ-রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, জ্বালানি রূপান্তর ও ডিজিটাল বিপর্যয়ের বর্তমান সময়ে বন্দরগুলো কোন প্রক্রিয়ায় নিজেদের অভিযোজিত করবে। চট্টগ্রাম বন্দরের জন্য এই বিষয়গুলো ছিল অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
দক্ষতার মাধ্যমে উত্থান : দেশের প্রতিটি ক্ষেত্রে অগ্রগতির ছাপ দৃশ্যমান। চট্টগ্রাম বন্দরে রেকর্ডসংখ্যক কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের সাফল্য প্রমাণ করছে, বাংলাদেশের শিল্প খাতের বুনিয়াদ সম্প্রসারিত হওয়ার সুবাদে বর্তমানে রপ্তানি ও আমদানি উভয় খাতেই আমাদের প্রবৃদ্ধি ঘটছে।
বন্দরের গতিশীলতা ধরে রাখতে আমরা ধারাবাহিকভাবে টার্মিনালগুলোর উন্নয়ন করছি, জাহাজের টার্ন-অ্যারাউন্ড টাইম কমিয়ে আনছি এবং রিয়েল-টাইম কার্গো ট্র্যাকিংয়ের লক্ষ্যে উন্নত ডেটা সিস্টেম চালু করছি।

বিশ্বসভায় বাংলাদেশের জোরালো কণ্ঠ : আইএপিএইচ বিশ্বব্যাপী বন্দরগুলোর অনুসরণীয় আন্তর্জাতিক মান নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সমিতির বার্ষিক সাধারণ সভায় নির্বাচিত পরিচালনা পর্ষদ সমুদ্র খাতের গবেষণা, নীতি প্রণয়ন ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের ক্ষেত্রে সব দিকনির্দেশনা প্রদান করে। এই প্রক্রিয়ার মধ্যে সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশ নিজেকে বৈশ্বিক এজেন্ডার একজন অনুসারী মাত্র নয়, বরং এজেন্ডার গতি নির্ধারক হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।

নেট-জিরো রূপান্তরে পথনির্দেশ : কোবে সম্মেলনে নেট-জিরো নির্গমন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। বিনিয়োগকারী ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোরও প্রত্যাশা, বন্দরগুলোর পরিবেশগত অগ্রগতির বিষয়টি এ ক্ষেত্রে বরাবর পরিমাপযোগ্যভাবে প্রদর্শিত থাকবে।

চট্টগ্রাম বন্দরের ক্ষেত্রে আমরা নেট-জিরো রূপান্তর প্রক্রিয়াটি ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করছি। এর উদ্দেশ্য পরিবেশ রক্ষার অঙ্গীকারটি যাতে শুধু মুখের কথায় আটকে না থেকে সেটি বাস্তব রূপ নিতে পারে। বিনিয়োগকারীরা যাতে পরিষ্কার দেখতে পায় গৃহীত পরিবেশবান্ধব পদক্ষেপগুলো অর্থনৈতিকভাবে ফলপ্রসূ।

ডিজিটাইজেশন ও সাইবার নিরাপত্তা : আধুনিক বন্দর বর্তমানে কংক্রিটের অবকাঠামোর চেয়ে সফটওয়্যার অবকাঠামোর ওপর বেশি নির্ভরশীল। ফলে আমাদের মনে রাখা উচিত, অটোমেশন উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করে সত্য, কিন্তু একই সঙ্গে সেটি সাইবার হুমকির ঝুঁকিটিও বাড়িয়ে তোলে।
ডেটানির্ভর দক্ষতা : কোবে সম্মেলনে প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের নবায়িত পোর্ট রিফর্ম টুলকিট এবং ২০২৫ কনটেইনার পোর্ট পারফরম্যান্স ইনডেক্স অনুযায়ী বর্তমান যুগে তথ্যই হচ্ছে যেকোনো বন্দরের প্রতিযোগিতা সক্ষমতার মূলভিত্তি। বন্দরে শিগগিরই এআইভিত্তিক ডিজিটাল ট্র্যাকিং ও মনিটরিং সিস্টেম চালু হবে। এই সিস্টেমে কার্গো, ট্রাক ও ট্রেনের চলাচল এক স্থান থেকে তদারকি করা সম্ভব হবে। ড্যাশবোর্ডের গুরুত্বপূর্ণ সূচকগুলো, যেমন—ক্রেন কতবার মাল তুলছে-নামাচ্ছে কিংবা জাহাজ সময়মতো আসছে কি না—এগুলোও দৃশ্যমান হবে। এই তথ্যগুলো চুক্তি-প্রণোদনায় যুক্ত করা হলে সরকারি-বেসরকারি উভয় পক্ষের স্বার্থ আরো সুসমন্বিত হবে এবং নিশ্চিত হবে গতিশীল উন্নতি।

বৈশ্বিক শুদ্ধাচার শিক্ষণ ও চর্চা : অগ্রণী অবস্থানে থাকতে হলে বাংলাদেশকে বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা গ্রহণের পাশাপাশি তাতে নিজের সক্রিয় অবদানও রাখতে হবে। এ ক্ষেত্রে আইএপিএইচ পরিচালিত ডিজিটাইজেশন, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও জলবায়ু অভিযোজন সংক্রান্ত ওয়ার্কিং গ্রুপে বাংলাদেশি প্রকৌশলীদের অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে আমাদের।

হামবুর্গ ও জাপানের সঙ্গে সরাসরি নৌ রুট : প্রত্যক্ষ সেবা প্রদান করাই আমাদের কর্মকৌশলের মূল লক্ষ্য। জার্মানির বাণিজ্য উন্নয়ন সংস্থার সহায়তায় পরিকল্পিত চট্টগ্রাম-হামবুর্গ রুট চালু করা সম্ভব হলে ট্রান্সশিপমেন্ট হাবের ওপর বাংলাদেশের বর্তমান নির্ভরতা ব্যাপকভাবে কমে আসবে এবং পরিবহন সময়সূচিতেও কাঙ্ক্ষিত স্থিতিশীলতা আনা সম্ভব হবে। একইভাবে, চট্টগ্রাম-জাপান নৌসংযোগ চালু হলে দেশের পোশাক, চামড়া ও ক্ষুদ্র প্রকৌশল খাতজাত পণ্যগুলোর জন্য উচ্চমূল্যের বাজারে প্রবেশের অনন্য সুযোগ তৈরি হবে। এই সুবাদে পরিবহনকাল এবং কার্বন নিঃসরণ, দুটিই হ্রাস পাবে।

অর্থায়ন ও গ্রাহকমুখিনতা : কোবে সম্মেলনে জোর দিয়ে বলা হয়েছে—যেকোনো টেকসই পরিকল্পনার মেরুদণ্ড হলো একটি বিশ্বাসযোগ্য অর্থায়ন। চট্টগ্রাম বন্দর এ ক্ষেত্রে একটি ‘এনার্জি হাব’ মডেল অনুসরণ করছে, যেখানে শিল্প জ্বালানির চাহিদা ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানি সরবরাহের সহাবস্থান—প্রথম দিন থেকেই অর্থনৈতিকভাবে টেকসইয়ের বিষয়টি নিশ্চিত করবে।
আগামীর পথ : কোবে সম্মেলনে চট্টগ্রাম বন্দরের অংশগ্রহণ আমাদের যে বার্তা দেয়, তা হচ্ছে, বর্তমান নৌবিশ্বে বাংলাদেশ বিশ্ব নেতৃত্বের একজন অনুসারী মাত্র নয়, বরং বৈশ্বিক পর্যায়ে প্রয়োজনীয় নেতৃত্ব প্রদানের জন্যও সে পূর্ণ প্রস্তুত। পাশাপাশি, ড. ইউনূসের আধুনিক ও বিশ্বমুখিন অর্থনীতির রূপকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও নির্ধারিত জাতীয় কর্মকৌশলের প্রাণকেন্দ্রে রয়েছে সামুদ্রিক উন্নয়নের প্রশ্নটি। এ ক্ষেত্রে আমাদের এখনকার দায়িত্ব ডেটানির্ভর দক্ষতা, নেট-জিরো প্রস্তুতি ও সাইবার রেজিলিয়েন্স অর্জন এবং এর পাশাপাশি ইউরোপ ও জাপানের সঙ্গে সরাসরি নতুন নৌপথ গড়ে তোলার মাধ্যমে এই রূপকল্পের একটি বাস্তবসম্মত রূপ দান করা।

লেখক : রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান, ওএসপি, এনডিসি, এনসিসি, পিএসসি, চেয়ারম্যান, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category