আর্তনাদ: একটি পা ও একটি স্বপ্ন কেড়ে নিল চটগ্রাম মিমি সুপার মার্কেটের অবহেলা
নিজস্ব প্রতিবেদক |
২০২৪ সালের ৫ জুন।
গরমে ক্লান্ত এক ব্যস্ত দুপুর। প্রতিদিনের মতোই কর্মজীবনের দায়িত্ব পালন করছিলেন তরুণ আইটি পেশাজীবী কাজী তৌহিদুল আলম।
কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের একটি ভয়াবহ বিস্ফোরণ তার জীবনের গতিপথ সম্পূর্ণ পাল্টে দেয়।
চট্টগ্রামের অভিজাত শপিং কমপ্লেক্স Mimi Super Market–এ একটি এসি ইউনিট বিস্ফোরণের ঘটনায় তিনি গুরুতর আহত হন এবং শেষ পর্যন্ত হারান তার বাম পা।
একজন দক্ষ কর্পোরেট কর্মীর জীবন মুহূর্তেই থেমে যায়—শুধু শারীরিকভাবে নয়, সামাজিক ও আর্থিকভাবেও।
কীভাবে ঘটলো সেই ভয়াবহ দুর্ঘটনা
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, ঘটনার দিন মার্কেটের ভেতরে হঠাৎ একটি বিকট শব্দে পুরো পরিবেশ কেঁপে ওঠে।
কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে চারদিকে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
মার্কেটের এসি সিস্টেমের একটি ইউনিট বিস্ফোরিত হয়ে ধাতব অংশ ছিটকে পড়ে আশপাশে থাকা মানুষদের ওপর। ওই সময় ঘটনাস্থলের কাছে থাকায় গুরুতরভাবে আহত হন কাজী তৌহিদুল আলম।
রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে দ্রুত চট্টগ্রাম এভার কেয়ার হাসপাতালে নেওয়া হলে লাখ লাখ টাকা খরচের করে ও
চিকিৎসকদের চেষ্টার পরও তার বাম পা কেটে ফেলতে হয়।
নিরাপত্তা নীতিমালায় বড় ধরনের প্রশ্ন
এই ঘটনায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে ভবনের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা নিয়ে।
স্থানীয় সূত্র ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিযোগ, মার্কেটটির শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার রক্ষণাবেক্ষণ দীর্ঘদিন ধরে সঠিকভাবে করা হচ্ছিল না।
শহরের উন্নয়ন সংস্থা চট্টগ্রাম উন্নয়ন কতৃপক্ষ ( সিডিএ)
–এর অনুমোদিত ভবন নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণ নীতিমালা অনুসরণ করা হয়েছে কি না, সেটিও এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জানা গেছে, এই ঘটনার পর সিডিএ কর্তৃপক্ষ মার্কেট কর্তৃপক্ষকে কারণ দর্শানোর নোটিশ প্রদান করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাণিজ্যিক ভবনে ব্যবহৃত বড় আকারের এসি ইউনিটে নিয়মিত প্রযুক্তিগত পরীক্ষা না হলে বিস্ফোরণ বা অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি তৈরি হয়।
ভুক্তভোগীর জীবন এখন অনিশ্চয়তায়
দুর্ঘটনার আগে কাজী তৌহিদুল আলম একটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানে আইটি বিভাগের সিনিয়র এক্সিকিউটিভ হিসেবে কর্মরত ছিলেন। প্রযুক্তি খাতে তার দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা তাকে একটি স্থিতিশীল ক্যারিয়ার গড়ে তুলতে সহায়তা করেছিল।
কিন্তু দুর্ঘটনার পর সেই কর্মজীবন প্রায় থমকে গেছে।
চিকিৎসা, পুনর্বাসন, ফিজিওথেরাপি—সব মিলিয়ে ব্যয় ক্রমেই বাড়ছে। পরিবারের ওপরও নেমে এসেছে গভীর অনিশ্চয়তা।
মালিকপক্ষের নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন
ভুক্তভোগীর পরিবারের অভিযোগ, দুর্ঘটনার পর থেকে মার্কেট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে তেমন কোনো মানবিক উদ্যোগ দেখা যায়নি।
মার্কেটের মালিক গোলাম ফারুকী মোটা অংকের টাকা দিয়ে থানাকে ম্যানেজ করেছে বলে দাবি করেছেন পরিবারের সদস্যরা।
একজন স্বজন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন—
“একটি দুর্ঘটনায় আমার ভাই তার পা হারিয়েছে, তার চাকরি হারিয়েছে। কিন্তু আজ পর্যন্ত কেউ এসে খোঁজ নেয়নি। এটা শুধু অবহেলা নয়, অমানবিকতার চরম উদাহরণ।”
আইন ও দায়বদ্ধতার প্রশ্ন
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের অবহেলার কারণে যদি দুর্ঘটনায় কেউ স্থায়ীভাবে আহত হন, তবে প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ফৌজদারি ও দেওয়ানি উভয় ধরনের আইনি পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব।
এর মধ্যে থাকতে পারে—
অবহেলার জন্য দায় নির্ধারণ
ক্ষতিপূরণ প্রদান
নিরাপত্তা ত্রুটির তদন্ত
ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা রোধে কঠোর ব্যবস্থা
নগরবাসীর নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত?
এই ঘটনা শুধু একজন ব্যক্তির দুর্ভাগ্য নয়, বরং নগরীর বাণিজ্যিক ভবনগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
চট্টগ্রামে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ শপিং মল ও মার্কেটে যাতায়াত করেন। কিন্তু এসব ভবনের প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা কতটা নিয়মিত পরীক্ষা করা হয়—সে প্রশ্ন এখন সামনে এসেছে।
মানবিক ও সামাজিক দায়
কাজী তৌহিদুল আলম আজ শুধু একজন দুর্ঘটনার শিকার নন; তিনি অবহেলা ও দায়হীনতার একটি প্রতীক হয়ে উঠেছেন।
তার হারানো পা হয়তো আর ফিরে আসবে না। কিন্তু সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো—
একজন নাগরিক যেন অন্যের অবহেলার কারণে সারাজীবনের জন্য অসহায় হয়ে না পড়েন।
(চলবে)